গত বছর ভারতের নারী দলকে প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক হারমানপ্রিত কৌর তিন সংস্করণেই জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ৩৭ বছর বয়সী এই তারকা।
অধিনায়কত্ব ছাড়ার পাশাপাশি দলকে 'ভালো অবস্থানে' রেখে যাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন হারমানপ্রিত। এখন তিনি 'আবারও শুধু খেলার ভালোবাসার জন্য খেলতে প্রস্তুত' বলেও উল্লেখ করেছেন।
ভারতের হয়ে হারমানপ্রিত পাঁচটি টেস্ট, ৫১টি ওয়ানডে ও ১৫৫টি টি-টোয়েন্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অধিনায়ক হিসেবে তার সর্বশেষ দায়িত্ব ছিল গত মাসে নিশিনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে ভারতকে টানা দ্বিতীয়বার সোনার পদক জেতানো।
অধিনায়কত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক দিন আগে গুয়াহাটিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন হারমানপ্রিত, সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা ও প্রধান কোচ অমল মুজুমদার। বৈঠকে নারী দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
নিজের বিদায়ী বার্তায় হারমানপ্রিত লিখেছেন, 'এটি সহজ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বছরের পর বছরের স্মৃতি, আবেগ, ত্যাগ ও এমন অনেক মুহূর্ত, যা সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকবে।'
তিনি আরও লিখেছেন, 'এই দল এবং ভারতীয় নারী ক্রিকেটের জন্য আমি আমার সবকিছু দিয়েছি—আমার রক্ত, ঘাম, সময়, এমনকি অনেক সময় নিজের খেলা ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষারও একটি অংশ বিসর্জন দিয়েছি। এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন নিজের পারফরম্যান্স, নিজের উন্নতি এবং নিজের চাওয়া পাশে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, দলের স্বার্থই সবার আগে।'
অধিনায়ক হিসেবে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। হারমানপ্রিত বলেন, 'অধিনায়ক হিসেবে আমাকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সব সিদ্ধান্ত সবাই বুঝতে পারেনি, সব সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ ছিল না। কখনো কখনো এর জন্য ব্যক্তিগত মূল্যও দিতে হয়েছে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটাই উদ্দেশ্য ছিল—এই দলকে আরও ভালো করা এবং অন্য খেলোয়াড়দের বেড়ে ওঠা, নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখা ও নিজেদের সেরা রূপটি তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া।'
গত জুনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে টানা দ্বিতীয়বার ভারতের বিদায়ের পর থেকেই অধিনায়কত্বে পরিবর্তনের গুঞ্জন জোরালো হয়েছিল। অমিতা শর্মার নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটিও বিষয়টি নিয়ে বিভক্ত ছিল বলে জানা গেছে। যদিও হারমানপ্রিত ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।
অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে হারমানপ্রিত বলেন, 'আজ আমি আবেগভরা হৃদয়ে অধিনায়কত্ব ছাড়ছি, তবে একই সঙ্গে মনে শান্তিও আছে। কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, আমার দল এখন ভালো অবস্থানে আছে। এই দলে প্রতিভা আছে, চরিত্র আছে, বিশ্বাস আছে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। সেই ভবিষ্যৎ দেখার এবং তার অংশ হয়ে থাকার জন্য আমি ভীষণ রোমাঞ্চিত।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি মনে করি, নিজের দায়িত্ব পালন করেছি। এই দলকে আমার সবকিছু দিয়েছি। গর্বের সঙ্গে দায়িত্ব বহন করেছি এবং ভারতীয় নারী ক্রিকেটকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব।'
বিদায়ী বার্তায় হারমানপ্রিত আরও বলেন, 'এখন আমার জন্য নতুন অধ্যায় শুরু করার সময়। আজ অধিনায়কত্বের অধ্যায় শেষ হতে পারে, কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। উত্থান-পতনের সব সময়ে যারা আমার পাশে ছিলেন—প্রতিটি সতীর্থ, কোচ, সহায়ক কর্মী, ব্যবস্থাপনা, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, পরিবারের সদস্য ও ভক্তদের ধন্যবাদ।'
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্মৃতি মান্ধানাকে ভারতের নতুন অধিনায়ক করার দাবি ক্রমেই জোরালো হয়েছে। গত ছয় মাসে শীর্ষ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নিজের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন মান্ধানা। পাশাপাশি ২০২৪ ও ২০২৬ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে নারী প্রিমিয়ার লিগের দুটি শিরোপা জিতিয়ে নেতৃত্বের সামর্থ্যেরও প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
২০১২ সালে প্রথমবার ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব করেছিলেন হারমানপ্রিত। তবে ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ভারতের বিদায়ের পরই তাকে এই দায়িত্বের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।
২০১৮ সালে মিথালি রাজের কাছ থেকে পূর্ণকালীন অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর ক্যারিবীয় অঞ্চলে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন হারমানপ্রিত। দুই বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতকে রানার্সআপও করেন তিনি।
তবে অধিনায়কত্ব ছাড়লেও সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে খেলা চালিয়ে যাবেন হারমানপ্রিত। আসন্ন নারী প্রিমিয়ার লিগে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের নেতৃত্বও দেওয়ার কথা রয়েছে তার। দলটি এবার তৃতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।