যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, আগে বিয়ে, তারপর সন্তান। তবে সেই চিরাচরিত ধারা বদলাতে শুরু করেছে দেশটিতে। কর্মজীবন গড়ে তোলা, আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হওয়া এবং সন্তান ধারণের বয়সসংক্রান্ত বাস্তবতার কারণে অনেক দম্পতি এখন একই সময়েই বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। একসময় সামাজিক সংকোচের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘শটগান ওয়েডিং’ এখন নতুন অর্থে ফিরে এসেছে লুকিয়ে নয়, বরং আনন্দের সঙ্গে।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মার্কিন তরুণ-তরুণীরা এখন আগের তুলনায় দেরিতে বিয়ে করছেন এবং সন্তান নিচ্ছেন। ফলে একসময় আলাদা ধাপ হিসেবে বিবেচিত বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখন অনেক ক্ষেত্রেই একসঙ্গে চলে আসছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর শহরাঞ্চলের ত্রিশোর্ধ্ব দম্পতিদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিয়ে পরিকল্পনাবিদ নোয়েল আহমাদের ভাষ্যমতে, আগে আমেরিকান নাগরিকরা বিয়ের পর পরিবারে নতুন সদস্যদের আগমনের কথা ভাবতেন বা পরিকল্পনা করতেন। কিন্তু এখন মানুষ নিজের জীবন নিজের মতো করে সাজাতে চায়। তার মতে, জীবনের ঘটনাগুলো নির্দিষ্ট কোনো ছকে বাঁধা নয়; সময় হলে সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই ঘটে।
একসময় বিয়েকে নতুন জীবনের সূচনা হিসেবে দেখা হতো। বাড়ির ঋণ, যৌথ ব্যাংক হিসাব কিংবা সংসার গড়ার পরিকল্পনা সবকিছুর শুরু হতো বিয়ের পর। কিন্তু এখন অনেক যুগল বিয়ের আগেই একসঙ্গে বসবাস করছেন এবং পরিবার গড়ে তোলার প্রস্তুতিও শুরু করে দেন। তাই তাদের কাছে বিয়ে নতুন যাত্রার শুরু নয়, বরং ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিবারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও। আগে গর্ভধারণের পর তড়িঘড়ি করে বিয়ে করাকে ‘শটগান ওয়েডিং’ বলে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। এখন সেই সংকোচ অনেকটাই অতীত। বরং অনেক হবু মা বিয়ের দিন গর্বের সঙ্গে বেবি বাম্প প্রদর্শন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে দেখা যাচ্ছে, কেউ বিয়ের মঞ্চেই গর্ভধারণের ঘোষণা দিচ্ছেন, কেউ মাতৃত্বকালীন বিয়ের পোশাক পরে ছবি তুলছেন।
দ্য নট-এর সম্পাদকীয় পরিচালক এসথার লির মতে, আধুনিক কনেরা গর্ভাবস্থাকে আর লুকিয়ে রাখার বিষয় বলে মনে করেন না। বরং এটি তাদের জীবনের আনন্দঘন মুহূর্তেরই একটি অংশ।
পরিসংখ্যানও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক ফিলিপ কোহেনের দেওয়া আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে প্রথমবার বিয়ে এবং প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়া নারীর হার ২০২০ সালের ১০ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিয়ে আয়োজনেও এসেছে নতুন ধারা। কেউ সন্তান জন্মের আগেই দ্রুত বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করছেন, আবার কেউ গর্ভাবস্থায় ছোট পরিসরে বিয়ে করে সন্তান জন্মের পর বড় আয়োজন করছেন। অনেক দম্পতি ব্যাচেলরেট পার্টি ও বেবি শাওয়ার একসঙ্গে করছেন, এমনকি হানিমুনের সঙ্গে ‘বেবিমুন’ও উদযাপন করছেন।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও প্রচলিত ধারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। দ্য নট-এর তথ্য বলছে, অধিকাংশ দম্পতিই এখনো আগে বিয়ে, পরে সন্তান এই পথ অনুসরণ করেন। আবার নোয়েল আহমাদের অনেক ক্লায়েন্টই এখনো সন্তান নেবেন কি না, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। অর্থাৎ, সম্পর্কের সংজ্ঞা যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি বদলাচ্ছে পরিবার গঠনের সময় ও ধরনও।