যারা গত ১৫ বছর ধরে গুম, খুন ও নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের কেউ কেউ আশকারা দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন না, সেই সাপই ছোবল দিয়ে শেষ করে দেবে।’
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শেষে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি। দলটি সব সময় লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে বিদায় নিয়েছে। কেউ যদি আবার সেই পথ অনুসরণ করতে চান, তাহলে তাঁদের পরিণতিও ভিন্ন হবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাঁরা প্রতিহিংসার বিচার চান না, চান ন্যায়বিচার। অন্যায়ভাবে কাউকে ফাঁসি দেওয়া তো দূরের কথা, কারও একটি লোম ধরে টান দেওয়াও তাঁরা চান না। তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিটি অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘এই বাংলাদেশ আমাদের সবার। কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তির হাতে বাংলাদেশকে ইজারা দেব না।’ দেশের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
দলের নেতাদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, জীবন একটাই—এই জীবন আল্লাহর জন্য ও মানবতার জন্য উৎসর্গ করতে তাঁরা প্রস্তুত। তবে কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না তাঁরা।
জামায়াতের নেতাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় তাঁর দলের নেতাদের পা বা ঠোঁট কাঁপেনি। কারণ, তাঁরা বিশ্বাস করতেন, তাঁদের ওপর জুলুম করা হয়েছে এবং শহীদ হয়ে তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
গুম ও হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, তাঁর দলের অনেক সহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন। তাঁদের কারও কারও কবর এখনো পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পাননি। অনেক মা-বাবা এখনো জানেন না, তাঁদের সন্তান বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। মারা গিয়ে থাকলে কোথায় তাঁদের কবর, সেটিও অজানা। গত ১৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, রাজনীতি যদি মানুষ হত্যা করার নাম হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারে। কিন্তু রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণে দেশ গড়া, দেশের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করার নাম হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের সেই যোগ্যতা নেই। এ কারণে বাংলাদেশে দলটির রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, দলটির মধ্যে যাঁরা ভালো মানুষ এবং দেশকে ভালোবাসেন, তাঁরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজে নেবেন। তবে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে—এমন কল্পনা না করার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাইয়ে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, মহান আল্লাহ যেন তাঁদের সবাইকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন। তাঁদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আজীবন স্মরণ করা হবে। তাঁদের রক্তের ঋণ শোধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, মানুষ ফ্যাসিবাদের পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই গণভোটে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। শুধু সংবিধানে কিছু পরিবর্তন আনা বা ঘোষণাপত্রের বাধ্যবাধকতা পূরণ করার জন্য মানুষ গণভোটে রায় দেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, জনগণ এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছে, যেখানে দেশের কল্যাণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং কেউ ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে না।
সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, তাঁর দলের সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদের যন্ত্রণা ভোগ করেছেন এবং বর্তমানে সরকারে রয়েছেন, তাঁদের অতীতের অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। অতীত ভুলে গেলে কোনো লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, অতীতেও তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, এখনো করবেন না। জনগণের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং সব হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য তাঁদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।