রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৬ অপরাহ্ন
নোটিশ
ইয়ুথ বাংলা টেলিভিশন ইউকে , ইউএসএ, অস্ট্রেলিয়া ,ফ্রান্স, কানাডা , সিংগাপুর , মালেশিয়াতে স্যাটেলাইটে সম্প্রচারিত টেলিভিশন চ্যানেল যা ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনলাইনে অনুষ্ঠান ও সংবাদ সম্প্রচারের জন্য এনওসি প্রাপ্ত হয়। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

মনের ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে

প্রতিবেদকের নাম

এ দেশের চলচ্চিত্রে ‘বেহুলা’-খ্যাত জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী-নির্মাতা কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। ষাটের দশকে অভিনয় জীবন শুরু করা তুমুল জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী ২০০৫ সালে তাঁর স্বামী জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের আলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে অর্জন করেন সেরা প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

এখনো এত প্রাণবন্ত থাকার রহস্য কী?
না.. না.. রহস্য বলে কিছু নেই, শত ঝড়-ঝঞ্ঝার মাঝেও মনের ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে। মানে মনকে ভালো রাখতে হবে। আমিই তো এর জীবন্ত উদাহরণ। জহিরের সঙ্গে ঘর বাঁধার পাঁচ বছরের মাথায় দেশে শুরু হয়ে গেল মুক্তির সংগ্রাম। একদিকে মুক্তিযুদ্ধ অন্যদিকে আমার জীবনযুদ্ধ। কোলের শিশুদের নিয়ে জহিরের সঙ্গে আমিও দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ৯ মাসের অবর্ণনীয় ঝড়ো হাওয়ার পর একসময় পূর্ব আকাশে স্বাধীনতার সূর্য উঠল। স্বাধীন দেশে আবারও জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি আমি। ‘কি সেই যুদ্ধ’?
‘শত প্রতিকূলতার মাঝেও মন ভালো রেখে এগুতে পারলে প্রাণের মাঝে জীবনের ছোঁয়া থাকবেই’ আজীবন প্রাণবন্ত থাকার এটিই একমাত্র উপায়।
জীবন নিয়ে কোনো দুঃখ আছে?
তা তো আছেই। যুদ্ধ চলাকালে যদি জহির রায়হান নিখোঁজ হতেন বা মারা যেতেন তাহলে মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিতে পারতাম, যুদ্ধে হারানোটা স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীন দেশে কেন তাঁকে নিরুদ্দেশ হতে হলো? অন্য কোনো বুদ্ধিজীবী তো শত্রুমুক্ত দেশে নিখোঁজ হননি। মনে হয় এর পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো ষড়যন্ত্র অবশ্যই ছিল। স্বাধীন শত্রুমুক্ত একটি দেশে এ ধরনের একজন মানুষকে হারানোর বেদনা কোনোভাবেই প্রশমন করা যায় না। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষাও থাকে না। আমার আজীবনের একটি আফসোস, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে জহির রায়হানকে হারালাম।
জহির রায়হানের মূল্যায়ন হয়েছে?
না, হয়নি। জহির রায়হান নির্মিত ছবিগুলো মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট নিয়ে নিল। ছবিগুলোর জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় গেলাম। কেউ ছবিগুলো বা এর জন্য একটি পয়সাও দিল না। শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিল। অনেকের কাছে অপ্রিয় হলাম। বড় কষ্ট হয়, জহির রায়হানের সম্পদ তাঁর উত্তরাধিকাররা কেন পাবে না। জীবনভর শুধু যুদ্ধই করে গেলাম। সুখ-শান্তির দেখা পেলাম না। নিজ দেশে জহির রায়হানের কোনো মূল্যায়ন হলো না। ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় একবার জহির রায়হানের পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, ‘তোমার মতো মেধাবী একজন মানুষের জন্ম ভারতে কেন হলো না।’
আপনার প্রথম অভিনীত ছবির গল্প কেমন?
১৯৬৬ সাল। প্রখ্যাত চিত্র নির্মাতা সুভাষ দত্ত আমাকে নিয়ে নির্মাণ করছেন ‘কাগজের নৌকা’ ছবিটি। চলচ্চিত্রে আমার প্রথম অভিনয়। ক্যামেরাসহ নির্মাণের অনেক ভাষাই ছিল আমার অজানা। চিত্রায়ণ চলছে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো আমি। সুভাষ দা লাইটম্যানকে বারে বারে বলছেন ওর চুলটা আরেকটু কাটো… আরেকটু কাটো…! আমি তো ভয়ে অস্থির, আমার এত সুন্দর লম্বা চুল কেটে ফেলবে। সুভাষ দাকে কিছু বলার সাহসও পাচ্ছি না। ততক্ষণে চোখে অশ্রু জমে গেছে। শর্ট শেষ হলে দেখলাম কই চুল তো কাটা হয়নি। সুভাষ দা’র কাছে কাটাকাটির বিষয়টি জানতে চাইলে হেসে উঠে তিনি বললেন, ‘ধুর বোকা মেয়ে, ধীরে ধীরে সব বুঝবি’। সেদিনের সেই কথা মনে পড়লে আজো আপন মনে হেসে উঠি।
অভিনয় জীবনের আর কোনো স্মৃতি?
এরপর ১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করলাম। এটি নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের প্রথম অভিনয়। ছবিটি বাম্পার হিট হয়ে গেল। এরপর আমি আর রাজ্জাক জুটি হয়ে বহু ছবিতে অভিনয় করলাম। সবই দর্শকনন্দিত হলো। আমাদের জুটির চাহিদা এতটাই বেড়ে গেল যে, তৎকালীন পাকিস্তানি চলচ্চিত্র প্রযোজকরাও আমাদের নিয়ে কাজ করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তাদের কথায়-‘যেতনা চাহেগা হাম দেঙ্গে, লেকেন সুচন্দা আওর রাজ্জাককো হামারি পিকচারমে চাইয়ে…।
প্রযোজনায় আসা কীভাবে?
বাবা তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে অসুস্থ অবস্থায় প্রায় আমাকে ডেকে বলতেন, তুমি একটি ছবি নির্মাণ কর। তাতে তোমরা তিনবোন একসঙ্গে অভিনয় করবে। একসময় বাবা মারা গেলেন। বাবার ইচ্ছা কখন পূরণ করব এই চিন্তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। শুটিং যে কোনো কাজের মধ্যে কিংবা ঘুমোতে যাওয়ার সময়েও কাগজ-কলম সঙ্গে রাখতাম। এটি অবশ্য আমার পুরোনো অভ্যাস। জহির রায়হান তার ছবির গল্প মনে পড়লেই আমাকে তা বলতেন আর সঙ্গে সঙ্গে আমি তা লিখে ফেলতাম। এমনকী আমি ঘুমিয়ে পড়লেও তার যদি গল্পের কথা মনে পড়ত আমাকে ডেকে তুলত লেখার জন্য। আমি ঘুম ঘুম চোখে বালিশের নিচে রাখা কাগজ-কলম বের করে লেখা শুরু করে দিতাম। ঠিক তেমনি করেই ‘তিনকন্যা’ ছবির গল্প লেখা হলো। গল্পে তিনবোনের চরিত্র হলো-আমি শান্ত স্বভাবের সাংবাদিক, ববিতা খুব চঞ্চল আর চম্পা ধুমধারাক্কা প্রকৃতির এক পুলিশ কর্মকর্তা। যেহেতু তিনবোনের গল্প তাই ছবির নাম ঠিক করলাম তিনকন্যা। ১৯৮৫ সালে ছবিটি পরিচালনা করলেন শিবলী সাদিক। বাস্তবের মতো পর্দাতেও তিনকন্যার ঝড় উঠল।
চলচ্চিত্রের দুর্দিনের জন্য দায়ী কারা?
আমাদের মধ্যে কিছু নির্মাতা-শিল্পী আছে যারা এক বালতি দুধের মধ্যে একফোঁটা চুনা ফেলে শিল্পটিতে ধস নামিয়ে দিয়েছে। আর এর পেছনে হয়তো দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংসের নীলনকশা কাজ করছে।
বর্তমানে অবসর কীভাবে কাটে?
আসলে ছোটবেলা থেকেই আমি প্রকৃতিপ্রেমী। ফুল-পাখি আমার খুব প্রিয়। টিউলিপ ফুল আর তুষারপাত দেখতে সুইজারল্যান্ড, আমেরিকায় ছুটে যাই। ভোরবেলা আজানের সুমধুর ধ্বনি আর পাখির মনকাড়া কলতান আমার প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। সে এক এমন ভালো লাগা যার কোনো শেষ নেই…।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা