খুলনা নগরীতে মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডে এক নারীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ভোরে মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন তুষার (২৭) নামের এক যুবক। এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যায় লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় খুশি (২৪) নামের এক গৃহবধূকে। নিহত দুজনই লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ থেকে, অন্যটি মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে। এই দুই খুনের ঘটনায় নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধজগতের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সন্ধ্যায় গৃহবধূ খুশি খুন:
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া ৭ নম্বর রোডের টাওয়ার গলির সামনে খুন হন খুশি। তিনি ওই এলাকার খোকনের মেয়ে এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসী ‘ব্লেড বাবু’র স্ত্রী। তাঁর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর আগে থেকেই ওত পেতে থাকা চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে সজোরে গুলি ছোড়ে। এতে তাঁর মাথায় সরাসরি গুলি লাগে। এ সময় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়েও কোপানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে দুর্বৃত্তরা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের মা জানান, ঘটনার সময় তিনি মেয়ের সঙ্গেই বাড়ির সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় মিরাজ নামের এক যুবক তাঁদের কাছে এসে কুশল বিনিময় করেন। ঠিক তার পরপরই চোখের সামনে তাঁর মেয়ের মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশাররফ হোসেন জানান, কী কারণে এবং কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে মাদকসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গতানুগতিকভাবে মাদক বা আধিপত্যের কথা বললেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা অনেকটাই ব্যর্থ হচ্ছে।
ভোরে যুবক তুষার খুন:
এর আগে বৃহস্পতিবার ভোর ৬টার দিকে নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারের পূর্ব পাশে আনসার উদ্দিন লেনে গুলিতে নিহত হন তুষার। তিনি লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকারই বাসিন্দা ছিলেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় পূর্ব বানিয়াখামারের লোহার গেট এলাকার একটি মাদ্রাসার সামনে, যেখানে ধস্তাধস্তি ও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। এরপর সেখান থেকে মোটরসাইকেলে পালানোর সময় প্রতিপক্ষের গুলিতে বুকে আঘাত পান তুষার। পরে আনসার উদ্দিন লেনে এসে মোটরসাইকেলসহ রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি মোটরসাইকেল এবং কিছু দূর থেকে দুটি গুলির খোসা উদ্ধার করে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন জানান, প্রাথমিক তদন্তে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহত তুষার স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ:
একই এলাকার দুজনকে দিনে ও রাতে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার অভিযোগ করেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে নগরজুড়ে মাদকের রমরমা কারবার চলছে। দিবারাত্রি নম্বরপ্লেটবিহীন ও উচ্চগতির মোটরসাইকেলে উঠতি বয়সী অপরাধীরা দাপিয়ে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
একই এলাকার দুই বাসিন্দার এমন মর্মান্তিক পরিণতি এবং প্রকাশ্য গুলি চালিয়ে দুর্বৃত্তদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অপরাধীদের নেটওয়ার্ক, মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়গুলো গভীরভাবে তদন্ত করছে পুলিশ। তবে এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।