যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন বিশ্বকাপকে ঘিরে যে পর্যটন ঝড়ের আশা করা হয়েছিল, তা হয়তো বাস্তবায়িত হবে না বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় সব আয়োজক শহরেই হোটেল বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।
এতে সংস্থাটি বলছে, ফিফার দেওয়া ‘পাঁচ মিলিয়নের বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে’ এমন দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই এবং এতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হোটেল সংগঠনটি দেশটির ৩২ হাজারেরও বেশি হোটেল ও মোট ফ্র্যাঞ্চাইজ হোটেলের ৮০ শতাংশের বেশি প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রতিবেদনে ফিফার ওপর আংশিকভাবে দায় চাপিয়ে বলা হয়, তারা নিজেদের ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত কক্ষ আগাম বুক করেছিল, যার ফলে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয় এবং হোটেল ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পরে ফিফা অনেক বুকিং বাতিল করলে হঠাৎ করে কক্ষের ঘাটতি ও বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। তবে ফিফা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হোটেল মালিকরা বলছেন, টিকিটের উচ্চ মূল্য, স্থানীয় পরিবহন খরচ, করের চাপ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে হোটেল খাতের জন্য এই বিশ্বকাপ আশানুরূপ ফল নাও আনতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোটেলগুলো বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে এবং সরকারি ও অফিসিয়াল পূর্বাভাসের ভিত্তিতেই পরিকল্পনা করেছে।
ফিফা-প্রণীত একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, এই বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক লাখ পঁচাশি হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে এবং মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় সতেরো দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখতে পারে।
হোটেল খাত মূলত দীর্ঘ সময়ের অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ওপর নির্ভর করেছিল, যারা তুলনামূলক বেশি খরচ করে থাকেন।
কিন্তু আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিদেশি দর্শনার্থী কম হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবও কমে যাবে, বিশেষ করে উদ্বোধনী ম্যাচের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিফার বড় আকারের আগাম বুকিং হোটেলগুলোর রাজস্ব পূর্বাভাস, কর্মী পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করেছে।
অনেক ক্ষেত্রে এই নীতি ‘কৃত্রিম চাহিদা তৈরি’ করেছে এবং প্রকৃত পর্যটক প্রবাহ কম হওয়ার বাস্তবতা আড়াল করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বলা হয়েছে, বোস্টন, ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস, ফিলাডেলফিয়া ও সিয়াটলের মতো শহরে ফিফার সংরক্ষিত কক্ষের প্রায় সত্তর শতাংশ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে।
তবে ফিফা এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, হোটেলগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ীই সব বুকিং ও কক্ষ মুক্ত করা হয়েছে এবং এটি বড় আকারের আয়োজনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের আগেই কক্ষ মুক্ত করা হয়েছে যাতে হোটেলগুলো সুবিধা পায়।
এছাড়া আয়োজকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, ভাড়া নির্ধারণ, কক্ষের ধরন ঠিক করা এবং ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
টিকিট ড্রয়ের পরপরই শহরভিত্তিক দল নিশ্চিত হওয়ার কারণে হোটেল ভাড়া বেড়ে যায়, পরে কিছুটা কমলেও এখনও তা অনেক শহরে রাতপ্রতি তিনশ ডলারেরও বেশি। অনেক ভক্তের বাজেট তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন ইংল্যান্ড সমর্থক, যিনি চারটি বিশ্বকাপে গেছেন, জানান তিনি ও তার পাঁচ সদস্যের দল প্রতি ব্যক্তি প্রতি রাত পঁচাত্তর ডলারের বাজেটে ভ্রমণ করছেন এবং শহরের বাইরে সস্তা হোটেল ও বাসস্থান বেছে নিচ্ছেন।
অন্যদিকে আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশন বিবিসি স্পোর্টকে জানিয়েছে, জুন ও জুলাইয়ে বুকিং আরও বাড়বে বলে তারা আশা করছে।
তারা বলেছে, অনেক দর্শক এখনও টিকিট ও সূচি চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
এয়ারবিএনবি বলেছে, এবারের বিশ্বকাপ তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আতিথেয়তা আয়োজন হতে যাচ্ছে।
তবে সামগ্রিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নকআউট পর্বে শেষ মুহূর্তের বুকিং বাড়লেও এই বিশ্বকাপ থেকে হোটেল খাত যে আয় আশা করেছিল, তা পূরণ নাও হতে পারে।