মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৬ অপরাহ্ন
নোটিশ
ইয়ুথ বাংলা টেলিভিশন ইউকে , ইউএসএ, অস্ট্রেলিয়া ,ফ্রান্স, কানাডা , সিংগাপুর , মালেশিয়াতে স্যাটেলাইটে সম্প্রচারিত টেলিভিশন চ্যানেল যা ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনলাইনে অনুষ্ঠান ও সংবাদ সম্প্রচারের জন্য এনওসি প্রাপ্ত হয়। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী বাসির

প্রতিবেদকের নাম

আমাদের দেশে একটি পরীক্ষার ফলাফলই যেন একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। ভালো ফল মানে সম্ভাবনা, আর প্রত্যাশিত ফল না এলে যেন সব শেষ। কিন্তু কিছু মানুষ সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন। মোহাম্মদ আবদুল বাসির তাদেরই একজন। একসময় তিনিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন। জিপিএর সমীকরণে সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। নতুন করে শুরু করেছিলেন সবকিছু। সেই নতুন শুরুর ঠিকানা ছিল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। আর আজ সেই পথ ধরেই তিনি যুক্ত হতে যাচ্ছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজিতে। তার গল্প তাই শুধু একজন তরুণের সাফল্যের গল্প নয়। এটি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখার গল্প।

জাপানের অত্যাধুনিক গবেষণার জগতে আজ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন বাংলাদেশের এই তরুণ। ল্যাবে তার আত্মবিশ্বাসী কাজ আর গবেষণার প্রতি নিষ্ঠা দেখলে মনে হতে পারে, তিনি জাপানেরই একজন গবেষক। অথচ তার শিকড় বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার ছোট্ট এক গ্রাম বিলচাপড়ীতে। গ্রামেই কেটেছে তার শৈশবের অনেকটা সময়। বাবার সরকারি চাকরির কারণে ছোটবেলা থেকেই বারবার বদলাতে হয়েছে শহর, স্কুল ও পরিবেশ। প্রতিবার নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার সেই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য আর অভিযোজনের ক্ষমতা। পরবর্তী জীবনে বিদেশের মাটিতে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি যেন সেখানেই হয়ে গিয়েছিল।

উচ্চমাধ্যমিকের পর কাঙ্ক্ষিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। অনেকের মতো তিনিও চাইলে সেখানেই স্বপ্ন থামিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে বেছে নেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং।

ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। অনেকের কাছে এটি ছিল বিকল্প পথ, কারও কাছে ভুল সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাসিরের ভাষায়, এটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শেখার পরিবেশকে, আর নিজের অদম্য ইচ্ছাকে।

সেই সময় বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তৌহিদ ভূঁইয়ার একটি কথা তার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিনি বলেছিলেন, ডেটা সায়েন্সই হবে ভবিষ্যতের পৃথিবীর অন্যতম চালিকাশক্তি। সেই কথার বাস্তব রূপ বাসির খুঁজে পান ড্যাফোডিলের ডেটা সায়েন্স ল্যাবে।

সেখানেই শুরু হয় তার নতুন হাতেখড়ি। আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র পড়া, গবেষণার পদ্ধতি শেখা, সমস্যা বিশ্লেষণ করা এবং বাস্তব সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান খোঁজা। শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম, ল্যাবভিত্তিক কাজ এবং দলগত প্রকল্প তাকে এগিয়ে দেয় নেতৃত্ব, উপস্থাপনা ও যোগাযোগ দক্ষতায়। আজ জাপানে অধ্যাপকদের সামনে গবেষণা উপস্থাপন করা কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের সাক্ষাৎকারে নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।

স্নাতক পর্যায়ের এই গবেষণার ভিত্তিতেই তিনি অর্জন করেন সম্পূর্ণ অর্থায়িত ABP ও JASSO স্কলারশিপ। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়, জাপানে উচ্চশিক্ষা।

একসময় তিনি পিএইচডি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারেন, নিজের গবেষণাকে শিল্পক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারলেই স্বপ্ন আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়িত হবে। তাই গবেষণাগার থেকে তিনি চোখ ফেরান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি শিল্প সেমিকন্ডাক্টরের দিকে। বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ দেখছে, তখন এই শিল্পই হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি কম্পিউটার ভিশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ডেটা বিশ্লেষণে নিজের দক্ষতা আরও গভীর করেন।

তবে এখানেও সফলতা একবারে আসেনি। জাপানের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রাকুতেনের সাক্ষাৎকারে গিয়ে ব্যর্থ হন তিনি। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকেই তিনি বেছে নেন নতুন শক্তি হিসেবে। কোথায় ভুল হয়েছে, কোন প্রশ্নের উত্তর আরও ভালোভাবে দেওয়া যেত, কীভাবে নিজের গবেষণা আরও গুছিয়ে উপস্থাপন করা যায়, তা নিয়ে শুরু হয় তার নিবিড় প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতিই তাকে নিয়ে যায় আরেকটি নতুন সম্ভাবনার সামনে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি আবেদন করেন বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজিতে। লিখিত পরীক্ষা ও বিভিন্ন মূল্যায়নের পর ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত সাক্ষাৎকার। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত একাধিক ধাপে সাক্ষাৎকার নেয়। কিন্তু তার কারিগরি জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণে সন্তুষ্ট হয়ে কর্তৃপক্ষ প্রথম সাক্ষাৎকারের পরই তাকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়। মাস্টার্স শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগেই নিশ্চিত হয়ে যায় তার ভবিষ্যৎ।

২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে তিনি জাপানে ম্যানুফ্যাকচারিং ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমন্বয়ে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করার কাজ করবেন তিনি। তার মতে, আধুনিক চিপ তৈরির কারখানাগুলো এখন সম্পূর্ণ ডেটানির্ভর। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও কার্যকর করার পেছনে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

এই দীর্ঘ পথচলায় তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন মা-বাবা। নিজের ওপর আস্থা হারানোর মুহূর্তেও মায়ের অটুট বিশ্বাস তাকে আবার এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। আর বাবার কর্মজীবনের সততা, শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমই ছিল তার জীবনের প্রথম পাঠশালা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের পড়াশোনায় কখনো আপস করেননি তারা। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা আর চাপের দিনগুলোতে পাশে থেকে নীরবে সাহস জুগিয়েছেন তার স্ত্রীও। বাসির বলেন, ‘এই অর্জন শুধু তার একার নয়। এটি মা-বাবা, শিক্ষক আর শুভাকাঙ্ক্ষী সবার সম্মিলিত সাফল্য।’

ভবিষ্যতে তিনি জাপানে অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। তার বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণার মানসিকতা ও দক্ষতা থাকলে কোনো সীমাবদ্ধতাই স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না।

তরুণদের জন্য তার পরামর্শও সহজ। আগে শুরু করো, একটি ক্ষেত্র বেছে নিয়ে গভীরে যাও। ক্লাসরুমের বাইরে ল্যাবে যুক্ত হও, গবেষণা করো, প্রকল্প বানাও আর স্পষ্ট করে নিজের কথা বলতে শেখো। আর ব্যর্থতাকে ভয় পেয়ো না। প্রতিটি ব্যর্থতার ভেতরে একটি শিক্ষা লুকিয়ে থাকে। শিক্ষাটা নিয়ে এগিয়ে গেলে ব্যর্থতা দেয়াল নয়, সিঁড়ি হয়ে যায়। একটি ব্যর্থতাকে কখনো নিজের পুরো গল্প লিখতে দিয়ো না। পাসপোর্ট আমাদের স্বপ্নের সীমা ঠিক করে না। ঠিক করে আমাদের চেষ্টা। বগুড়ার গ্রামের একটি সাধারণ ছেলে যদি পারে, তবে তুমিও পারবে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষণার পরিবেশ ও শেখার সুযোগকে পুঁজি করেই তৈরি হয়েছে তার এই বৈশ্বিক যাত্রার ভিত্তি। বগুড়ার বিলচাপড়ী গ্রাম থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর এই গল্প তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশের তরুণদের অফুরান সম্ভাবনারই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা