উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমানো, অপচয় রোধ ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)–এর বৈঠকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেড় বছরের মেয়াদে অন্তত ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে অতিরিক্ত যোগ হয়েছে প্রায় ৭৯ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, বারবার সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি বন্ধ হবে। বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)–এর আওতাভুক্ত প্রকল্পগুলো কঠোর যাচাই–বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে অনুমোদন পাবে—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তবে একনেক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সময়ে একনেকের ১৯টি বৈঠকে মোট ৮৭টি চলমান প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। প্রতি বৈঠকে গড়ে প্রায় পাঁচটি প্রকল্পে পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি প্রকল্পে ব্যয় কমানো হয়েছে—মোট সাশ্রয় ৯৫০ কোটি টাকা, যা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর আগের ব্যয়ের মাত্র ২.৪৫ শতাংশ। বিপরীতে ৬৫টি প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা।
আরও ১৫টি প্রকল্পে ব্যয় অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবায়নকাল বাড়ানো হয়েছে।
এই ৬৫টি প্রকল্পের প্রাথমিক মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ চার হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ গড়ে ব্যয় বেড়েছে ৩৫.৬৭ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল উন্নয়ন প্রকল্পে কঠোর নজরদারি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। কিন্তু বারবার প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানো সেই প্রত্যাশার সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।
ইউনূস সরকারের প্রথম একনেক বৈঠকেই সংশোধিত হয় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প—ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। একই বৈঠকে নারী ক্ষমতায়নে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসূচির ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় এক হাজার ৬৩০ কোটি টাকা।
মেয়াদের শেষ দিকে প্রথমবারের মতো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে এক লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৬ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা (২২.৬৩ শতাংশ)।
ঢাকার সুপেয় পানি সরবরাহের পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা—প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প–২–এ ব্যয় বেড়েছে ৭ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পে অতিরিক্ত ১ হাজার ৪১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ে ছোট স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ব্যয় বেড়েছে ৪৮ শতাংশ।
তবে ব্যতিক্রমও আছে। ঢাকা মেট্রো রেল প্রকল্পে ব্যয় কমানো হয়েছে ৭৫৪ কোটি টাকা। স্টেশন এলাকার উন্নয়ন ও কিছু জমি অধিগ্রহণ বাদ দেওয়ায় এ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।
দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৫টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, যার মোট ব্যয় দুই লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। এসব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। বিপরীতে ২১টি জেলার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্পই নেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম মূল্যায়নে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে এবং এডিপির ব্যয়ের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লুটপাট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও প্রকল্প সংশোধনের পুরনো সংস্কৃতি ভাঙতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বরং ব্যয় কমানোর অঙ্গীকার করেও শেষ পর্যন্ত ৬৫টি প্রকল্পে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা জনঅর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলছে। এখন দেখার বিষয়—বর্তমান সরকার এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা কীভাবে সামাল দেয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বাস্তব সংস্কার আনতে পারে কি না।