প্রতিবছরের মতো এবারও ৪ ফেব্রুয়ারি আলোচনা, সেমিনার বক্তব্য ও বিবৃতির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব ক্যানসার দিবস। এসব আয়োজনে বক্তারা দেশে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন; সেই সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্যানসারের অপ্রতুল চিকিৎসার সমালোচনা করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার-আইএআরসির গ্লোবোক্যান ২০২২-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর অনুমিত ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার। এই রোগে মারা যায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেক গবেষণায় বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারশর বেশি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিদিন তিন শতাধিক মানুষ ক্যানসারে মারা যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্যানসারের প্রকোপ বাড়লেও দেশে এর তুলনায় চিকিৎসাব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল। সমন্বিত চিকিৎসা কেন্দ্রের অভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের কারণে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। তাদের পরামর্শ, দেশে দ্রুত সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কেমোথেরাপি, সার্জারি ও রেডিওথেরাপির পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা থাকবে। তবে তারও আগে সুস্থ অবস্থাতেই নিয়মিত এসব পরীক্ষা করানো খুব জরুরি বলে মনে করেন তারা। কেউ কেউ বলছেন, রোগীকে চিকিৎসার জন্য শহরমুখী না করে, রোগীর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া দরকার।
বিশ্ব ক্যানসার দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। এ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারশর বেশি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিদিন তিন শতাধিক মানুষ ক্যানসারে মারা যাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য মতে, দেশে প্রধান পাঁচ ধরনের ক্যানসারের মধ্যে রয়েছে খাদ্যনালি, স্তন, মুখগহ্বর, ফুসফুস ও জরায়ুতে আক্রান্ত। এসবের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যানসারে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, উন্নত দেশের মতো সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে রোগীদের সময়মতো মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. কাজী মুস্তাক আহমেদ বলেন, দেশে দ্রুত সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কেমোথেরাপি, সার্জারি ও রেডিওথেরাপির পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাস্টফুড, ধূমপান ও বায়ুদূষণ ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
দেশে ৩৬ ধরনের ক্যানসার পাওয়া গেছে
বিএসএমএমইউর পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণা করে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার পুমদি, শাহেদল, আড়াইবাড়িয়া ও গোবিন্দপুর ইউনিয়নে ২৭ হাজার পরিবারের ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৭৫ জনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ক্যানসারের রোগী ১৩৩ জন। সেই হিসাবে প্রতি লাখে ক্যানসার রোগী ১১৪ জন। নারীর তুলনায় পুরুষের মধ্যে ক্যানসারের প্রবণতা বেশি।
গবেষকরা হোসেনপুরে ৩৬ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্তন ক্যানসার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে ঠোঁট, মুখগহ্বর ও কণ্ঠনালির ক্যানসার। পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে (প্রথম পাঁচটি) কণ্ঠনালি, পাকস্থলি, ঠোঁট, মুখগহ্বর, ফুসফুস ও খাদ্যনালির ক্যানসার। নারীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে (প্রথম পাঁচটি) স্তন, জরায়ুমুখ, ঠোঁট ও মুখগহবর, থাইরয়েড ও গর্ভাশয়ের ক্যানসার।
উপস্থাপনায় মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্যানসারের পাশাপাশি আরও এক বা একাধিক রোগে ভুগতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ, ১১ দশমিক ৩ শতাংশের ডায়াবেটিস, ৮ দশমিক ৩ শতাংশের হৃদরোগ, ৩ শতাংশের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ এবং ৩ শতাংশের স্ট্রোকের ইতিহাস আছে।
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় এমন বিষয়ের সঙ্গে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সম্পর্কের দিকটি গবেষণায় উঠে এসেছে। পুরুষের মধ্যে ৭৩ শতাংশ ধূমপানে অভ্যস্ত। ৪১ শতাংশ পুরুষ ও ৬১ শতাংশ নারী সাদাপাতা, তামাক ও জর্দায় অভ্যস্ত। পাশাপাশি ৬৫ শতাংশ পুরুষ ও ৭৫ শতাংশ নারীর পান-সুপারি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে।
অনুষ্ঠানে গবেষকরা জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা মূলত ঢাকা শহরে এসেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান ও চিকিৎসা নেন। রোগীদের মধে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রয়োজনীয় সমন্বিত চিকিৎসা পেয়েছিলেন। ১৩ শতাংশ রোগী পেয়েছেন শুধু কেমোথেরাপি, ২ দশমিক ৩ শতাংশ পেয়েছেন শুধু রেডিওথেরাপি এবং ১১ দশমিক ৩ শতাংশের অস্ত্রোপচার হয়েছে। কোনো চিকিৎসা পাননি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী।
নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিষয়ভিত্তিক পরিচালক অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, পরিস্থিতি বোঝার জন্য এবং প্রতিরোধ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার জন্য জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি উপযুক্ত কৌশল। এতে ক্যানসারের চাপটি বোঝা যায়। এই গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ ক্যানসারের ক্ষেত্রে ১ নম্বরে আছে।
এই সেবা শুরু হয় ক্যানসার থেকে সুরক্ষা অর্থাৎ প্রতিরোধ দিয়ে : গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও বাংলাদেশ ক্যানসার ফাউন্ডেশন মহাসচিব অধ্যাপক মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন আমাদের সময়কে বলেন, ক্যানসার এখন আর কেবল একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। বাংলাদেশে এটি একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার-আইএআরসির গ্লোবোক্যান-২০২২ এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর অনুমিত ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার। এই রোগে মারা যায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষ। তিনি বলেন, কমিউনিটি অনকোলজি বলতে বোঝায়, স্থানীয় পর্যায়ে ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, ফলোআপ এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ারকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা। অর্থাৎ, রোগীকে চিকিৎসার জন্য শহরমুখী না করে, চিকিৎসাকে রোগীর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। এটি শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ নয়, বরং মানবিক ও সমতার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার। তিনি আরও বলেন, ক্যানসার সেবা বলতে এখনও আমাদের দেশের অনেক মানুষের ধারণা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মধ্যেই আবদ্ধ। এই সেবা শুরু হয় ক্যানসার থেকে সুরক্ষা অর্থাৎ প্রতিরোধ দিয়ে। আরও আছে পেলিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবা।
সুস্থ অবস্থাতেই নিয়মিত এসব পরীক্ষা করানো খুব জরুরি : শান্তি ক্যানসার ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় অনেক ক্যানসারেরই তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু দেহের ভেতর নীরবে বাড়তে থাকে ক্যানসার। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসাপদ্ধতি অনেকটা সহজ হয়ে যায়। রোগীর শারীরিক জটিলতা কম হয়, চিকিৎসায় সাফল্যের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তাই সুস্থ অবস্থাতেই নিয়মিত এসব পরীক্ষা করানো খুব জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন তামাক সেবন থেকে ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা বেশি) তামাক ব্যবহার করে। তার মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে, প্রতিদিনের হিসাবে যা ৫৪৫ জনেরও বেশি। মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে অধিকাংশই ফুসফুসসহ অন্যান্য ক্যানসারে আক্রান্ত।