কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে জনতার হাতে আটক হওয়া ভাড়াটে খুনি মো. হেলালের সঙ্গে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আর এতে জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর সিকদারের নাম এসেছে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে। এই পরিকল্পনার সবকিছু ওসি জানতেন বলেও দাবি করেছেন হেলাল।
গ্রেপ্তার হেলাল (২৫) মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয় জনতার হাতে আটক হয়ে জাহাঙ্গীর হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলহাজতে রয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পাওয়া ফোনালাপের বর্ণনা অনুযায়ী, হেলাল বলেন, আলমগীর শিকদার তাদের ভাড়া করেছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল যেভাবেই হোক জাহাঙ্গীরের একটি হাত কেটে ফেলতে হবে, এতে তিনি মারা গেলেও সমস্যা নেই। হেলাল আরও দাবি করেন, তারা পেশাদার খুনি নন। চুরি, ছিনতাই ও মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকার লোভে পড়ে তারা এ কাজে জড়িয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরকে হত্যা করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।
ফোনালাপে হেলাল আরও বলেন, তার বন্ধু রিয়াজের সঙ্গে খোকা নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে আলমগীরের যোগাযোগ হয়। কারাগারে খোকা তাদের আলমগীরের নাম বলার জন্য গালাগাল করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। হেলালের ভাষ্য, তাদের নিষেধ করা হয়েছিল আলমগীরের নাম না বলতে। নাম বললে কে তাদের জামিন করাবে, সেই প্রশ্নও করা হয়েছিল।নিহত জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর (কালো বৃত্তে)
হেলাল দাবি করেন, তিনি ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছেন, এ কাজ আলমগীর করিয়েছেন। তার অভিযোগ, আলমগীরের নাম বলার কারণে তাদের মারধর করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে খোকাকে রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে বলেও ফোনালাপে উল্লেখ করেন তিনি।
অপরপ্রান্ত থেকে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রীকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, তোমাকে কি জেল থেকে নিয়ে আসছে, উত্তরে খুনি হেলাল বলেন, না না, আমি জেল থেকে আসি নাই। আমি ঢাকা থেকে আসছি। মিঠামইনে আমি ১৫-২০ দিন ছিলাম তারপর সব কিছু বুঝেছি কে করাচ্ছে, কে আনছে, কে টাকা দিয়েছে। আলমগীর ভাইয়ের একজন লোক ছিলো, সে আমাদের খাওয়া দাওয়ার টাকা দিতো, লোকটার নাম মনে নাই কিন্তু উচ্চা, লম্বা, কালো ছিলো, সে অন্য এলাকার মেম্বার। রিয়াজ এর সাথে আলমগীর এর সরাসরি কথা হতো। এক পর্যায়ে খুনি হেলাল দাবি করেন, ওসি সবকিছু জানতো। হেলালের দাবি আলমগীরের নাম বলার পর ওসি তাকে মারধর করে এবং বলে, তুই আলমগীরের নাম বলছিস কেন? তুই টাকা পাবিনা বলে তাকে গালিও দেওয়া হয়।
ফোনালাপের সত্যতা নিশ্চিত করতে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘কল রেকর্ডটি সঠিক। আমাদের এলাকার একজনের মাধ্যমে আমার কাছে খবর আসে যে, একজন আমার সাথে জেল থেকে কথা বলবে এবং সে ভাড়াটিয়া খুনি হেলাল। তারপর কথা হয়, সে কিভাবে মিঠামইন এসেছিল, কে তাকে এনেছিল, সব কিছু বলেছে সে। আলমগীর যে তাদের ভাড়া করে এনেছিল, সেটাও বলেছে।’
খুনির সাথে কথা বলার পর তাদের পারিবারের বক্তব্য কি জানতে চাইলে তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘আলমগীর যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এটা আমরা সবাই আগে থেকেই সন্দেহ করেছি। সবাই এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাচ্ছে।’
আলমগীর শিকদার এর সাথে তাদের যোগাযোগ আছে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না আমাদের কোনো যোগাযোগ নাই, কোথায় আছে জানি না।’
বিভিন্ন সূত্র এবং আলমগীর শিকদারের ফেসবুক থেকে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে আলমগীর শিকদার সুইজারল্যান্ডে আছেন।
তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এইগুলো ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যে ছেলের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি হয়েছে অনেকদিন আগে, এখন তার বক্তব্য কিভাবে আসে? আমি জড়িত থাকলে আমাকে ধরলো না কেন? আমি এখন দেশের বাইরে আছি আবার দেশে আসবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে ছেলে কথা বলেছে সে তো আমার নাম বলে নাই, খোকার নাম বলেছে তাহলে খোকা বলুক আমার নাম, আমি জড়িত। আমার ভাইয়ের বউ আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। সে তো এখন আওয়ামী লীগের টান টানবেই। আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করবে আমিও দেশে এসে সংবাদ সম্মেলন করবো।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত জাহাঙ্গীর ও তার ছোট ভাই আলমগীর শিকদারের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছিলো। সেই বিরোধকে কেন্দ্র করেই আলমগীরের মনে ক্ষোভ ও হিংসার সৃষ্টি হয়েছিল বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয়রা। যদিও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।
ফোনালাপের নাম আসার বিষয়ে মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি কোনো ফোনালাপ শুনি নাই। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি ডিবিতে তদন্তের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তারাই তদন্ত করছেন।’
উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে নিজ বাড়ির সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে ভাড়াটিয়া খুনিরা। ১৮ জুলাই নিহত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে ৩ জনকে আসামি করে মিঠামইন থানায় মামলা দায়ের করেন। জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।