জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭-এ নবায়নযোগ্য জ্বালানিখাতের জন্য ঘোষিত কর ও শুল্ক প্রণোদনাকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা। তবে এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপের ড. সিসেফ এফেন্দি কনফারেন্স হলে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ এ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রণোদনা: টেকসই জ্বালানি-ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় ভিত্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন ধরা’র সহ-আহ্বায়ক এম. এস. সিদ্দিকী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এখন শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
জালাল আহমেদ বলেন, বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিখাতের জন্য দেওয়া নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে তিনি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, বিনিয়োগ সহায়তা বৃদ্ধি, নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধে শফিকুল আলম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশের জ্বালানিখাতে আমদানিনির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, বাজেটে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রস্তাব শিল্প ও বাণিজ্যিকখাতে রুফটপ সোলার স্থাপনের ব্যয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে।
ধরা’র সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, সরকারের ইতিবাচক মনোভাব ও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে। তিনি অব্যবহৃত সরকারি জমিতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে এম. এস. সিদ্দিকী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক মডেলকে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশগত সুবিধার অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, প্রযুক্তিগত বাধা দূরীকরণ এবং যুবসমাজের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম, বুয়েটের অধ্যাপক (অব.) ড. ইজাজ হোসেন, স্রেডার পরিচালক (নবায়নযোগ্য জ্বালানি) প্রকৌশলী মো. মুজিবুর রহমান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সাকিব বিন আমিন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধি দলের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (জ্বালানি ও পরিবেশ) তানজিনা দিলশাদ এবং জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ।
বক্তারা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিখাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, গ্রিড আধুনিকীকরণ, শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, গৃহস্থালি ব্যবহারকারী এবং স্থানীয় সেবা প্রদানকারীদের জন্য প্রণোদনা আরও সহজলভ্য করার আহ্বান জানান তারা।
তারা আরও বলেন, জাতীয় বাজেটে ঘোষিত প্রণোদনা বাংলাদেশের জ্বালানিখাতকে আরও টেকসই ও স্বনির্ভর করে তুলতে সহায়ক হবে। তবে কার্যকর বাস্তবায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। রুফটপ সোলার, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।