কিশোরগঞ্জ শহরের হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩টি দানবাক্সে মিলল ৪৩ বস্তা টাকা। এস ছাড়াও দানবাক্সে পাওয়া গেছে বিপুল স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা। ছয় মাস পর দান বাক্সগুলো খোলা হয়েছে।
আজ শনিবার (সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসনা খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
প্রথাগতভাবেই দানবাক্স থেকে টাকা বের করে প্রথমে বস্তায় ভরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয়। সেখানে গণনার কাজ শুরু হয়। এ কাজে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জামিয়া এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ চার শতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন গণনার কাজে। এরই মধ্যে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ ১০ কোটি টাকা গননা হলে তা ব্যাংকে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর, তিন মাস ২৭ দিন পর দানবাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায়।
জানা গেছে, সাধারণত প্রতি তিন মাস পর পর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হলেও এবার বিভিন্ন কারণে ছয় মাস পর খোলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দানের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে আরও দুটি দানবাক্স যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এসে এখানে দান করেন। অনেকের বিশ্বাস, এ মসজিদে দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই দিন দিন বাড়ছে দানের পরিমাণ।
কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, দানবাক্স খোলা ও টাকা গণনার কার্যক্রমে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ১০ জন র্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকরাও কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন।
তিনি বলেন, পুরো কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনে সে অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে মোট ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে। এ ছাড়া মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দান করা যায়। ইতোমধ্যে ওয়েবসাইটের বাংলা সংস্করণও চালু হয়েছে এবং অনলাইনে এ পর্যন্ত ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান জমা পড়েছে ।
তিনি বলেন, পাগলা মসজিদের আধুনিক ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি মসজিদের নামে কেনা হয়েছে। বর্তমানে কমপ্লেক্সের নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও চলছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মসজিদের তহবিল থেকে কমপ্লেক্সের মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর সব ধরনের ব্যয় বহন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ব্যয় এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়। তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্যও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আজকের বিশাল গণনা কার্যক্রমে জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী, পাগলা মসজিদ মাদ্রাসার ১০৬ জন শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, মসজিদের ৩৫ জন কর্মচারী এবং জেলা প্রশাসনের ১৯ জন স্টাফ অংশ নিচ্ছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রায় ৩০০ বছর আগে নরসুন্দা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা একটি টিলায় মসনদে আলা ঈশা খাঁর বংশধর, শহরের হয়বতনগর জমিদার দেওয়ান হয়বত খানের আত্মীয় দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে পাগলা বিবি ওই টিলায় নামাজ আদায় করতেন। বিষয়টি দেওয়ান হয়বত খানের নজরে এলে সেখানে তিনি সেখানে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরম্পরায় মানুষ যাকে পাগলা মসজিদ হিসেবেই জেনে আসছে।
কথিত আছে, এ মসজিদে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয় এবং ওই ধারণা থেকেই বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ মানত ও দান নিয়ে এখানে আসেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি পবিত্র কোরআন শরিফ, স্বর্ণ, রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা, এমনকি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, ফলফলাদি দান করেন মনোবাসনা পূরণের আশায়।
বর্তমান মসজিদের অবকাঠামো ঠিক রেখে ছয়তলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন একটি ইসলামিক আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। যেখানে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন ৩৫ হাজার মুসল্লি। এর মধ্যে ৫ হাজার নারী মুসুল্লির জন্য থাকবে আলাদা নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা।
তবে কমপ্লেক্স নির্মাণের আগে মুসুল্লিদের নির্বিঘ্নে কমপ্লেক্সে প্রবেশ এবং স্বাচ্ছন্দ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পথ আগে নির্মাণের দাবি উঠেছে, যা অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা মনে করেন, এজন্য শহরের গাইটাল বটতলা থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত এবং পাগলা মসজিদ থেকে হারুয়া চৌরাস্তা হয়ে আখড়া বাজার পর্যন্ত চার লেনের রাস্তা করতে হবে। অন্যথায় মসজিদের চারপাশে এক কিলোমিটার পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে।