মানবদেহ একটি বিস্ময়কর যন্ত্র। এর প্রতিটি অঙ্গই আমাদের জীবিত ও সক্রিয় রাখতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। এই জটিল ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লিভার বা যকৃত। এটি শরীরের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ অঙ্গ। একইসঙ্গে অবিরাম রাসায়নিক এক কারখানা। এখানে প্রতিদিন ঘটে শত শত গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া। হজম, শক্তি উৎপাদন, রক্ত পরিশোধন, রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে লিভারের ভূমিকা অপরিহার্য।
লিভারের মূল কাজ হলো শরীরে প্রবেশ করা পুষ্টিগুণগুলো রূপান্তর ও নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে শরীর সঠিকভাবে শক্তি পায় ও ভারসাম্য বজায় থাকে। এটি খাদ্যের প্রোটিন, চর্বি ও শর্করা ভেঙে শরীরের প্রয়োজনমতো ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর পদার্থ, যেমন ওষুধের অতিরিক্ত উপাদান বা অ্যালকোহল, লিভার ভেঙে বিষমুক্ত করে। এই অঙ্গটি রক্তে জমাট বাঁধার উপাদান তৈরি করে, যা আঘাতের পর রক্তপাত বন্ধে সাহায্য করে। এছাড়া এটি গ্লাইকোজেন আকারে শক্তি সঞ্চয় রাখে, যা শরীরের প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, লিভার বিলিরুবিন ও পিত্তরস তৈরি করে, যা চর্বি ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীরের প্রতিটি কোষ, প্রতিটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে লিভারের কোনো না কোনো সংযোগ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা বা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে যখন এটির কার্যক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন দেখা দেয় নানা জটিল লিভার রোগ।
আমাদের দেশে লিভার রোগের দুটি প্রধান কারণ হলো- হেপাটাইটিস-বি ও সি ভাইরাস সংক্রমণ এবং ফ্যাটি লিভার। হেপাটাইটিস ভাইরাস রক্ত বা শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা পরে সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারে রূপ নেয়। অন্যদিকে, ফ্যাটি লিভার অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণ ও স্থূূলতার কারণে হয়। এছাড়া অ্যালকোহল সেবন, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও লিভারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় লিভারের রোগ বোঝা যায় না। তবে এর কিছু লক্ষণ রয়েছে। অকারণে ক্লান্তি ও দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, পেট ফোলা বা ডান দিকের উপরের অংশে অস্বস্তি, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস), চুলকানি এবং দ্রুত ওজন হ্রাসের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ।
লিভার সুস্থ রাখতে হলে প্রতিরোধ সবচেয়ে কার্যকর উপায়। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা গ্রহণ নিরাপদ ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পাশাপাশি অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে। খাদ্যাভ্যাসে পরিমিত চর্বি, বেশি পরিমাণে ফলমূল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান শরীরের টক্সিন বের করতে সাহায্য করে, যা লিভারের ওপর চাপ কমায়। নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শুধু ওজনই নিয়ন্ত্রণে রাখে না, বরং লিভারে চর্বি জমার প্রবণতাও কমায়। এছাড়া প্রতিবছর একবার লিভার ফাংশন টেস্ট করানো ভালো। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা শনাক্ত করা এবং বড় জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
লিভার কেবল একটি অঙ্গ নয়, এটি আমাদের জীবনের ভারসাম্যের প্রতীক। লিভারের যত্ন মানে নিজের জীবনের যত্ন নেওয়া। আসুন, সচেতন হই, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, টিকা গ্রহণ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করে লিভারের রোগ প্রতিরোধ করি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেপাটোলজি বিভাগ
চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা। হটলাইন : ১০৬৭২