রামিসা,
তুমি চলে যাওয়ার পর
এই পৃথিবীটাকে আর পৃথিবী মনে হয় না,
মনে হয়—
এটা একটা নিষ্ঠুর শ্মশান,
যেখানে প্রতিটা নিশ্বাসে
আমি নিজের ব্যর্থতার গন্ধ পাই।
আমি তো শুধু তোমার বাবা হতে চেয়েছিলাম,
তোমার ভয় পেলে বুক হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম,
ঝড় এলে ছায়া হতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু শেষ পর্যন্ত—
আমি কিছুই হতে পারলাম না।
যে ছোট্ট দু’টা হাত
আমার আঙুল শক্ত করে ধরতো,
আজ সেই হাত নেই—
শুধু আমার দুই হাত ভরে আছে
অসহ্য শূন্যতায়।
রামিসা,
তুমি কি জানো?
একজন বাবার সবচেয়ে বড় মৃত্যু
তার সন্তানের চলে যাওয়া নয়,
বরং বেঁচে থেকেও প্রতিদিন
নিজেকে অপরাধী মনে হওয়া।
আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখি না আর,
কারণ সেখানে একজন মানুষ না—
একজন ব্যর্থ বাবা দাঁড়িয়ে থাকে।
যে তার সন্তানের কান্না থামাতে পারেনি,
ভয় দূর করতে পারেনি,
পৃথিবীর নিষ্ঠুর হাত থেকে
একটুও আগলে রাখতে পারেনি।
তোমার ছোট্ট জুতো জোড়া
আজও দরজার পাশে পড়ে আছে,
আর আমি প্রতিদিন ভেঙে যাই—
এই ভেবে,
তুমি আর কখনো দৌড়ে এসে বলবে না,
বাবা, কোলে নাও…
রাত গভীর হলে
আমি তোমার নাম ধরে কাঁদি।
এমনভাবে কাঁদি,
যেন কান্নার শব্দ আকাশ ফুঁড়ে
তোমার কাছে পৌঁছে যায়।
যদি একবার…
শুধু একবার তুমি ফিরে এসে বলতে—
বাবা, আমি ভালো আছি।
জানো মা,
মানুষ ভাবে সময় সব ঠিক করে দেয়।
মিথ্যে।
সময় শুধু মানুষকে
হাসতে হাসতে ভেতরে মরে যেতে শেখায়।
তুমি চলে যাওয়ার পর
আমার ভেতরে প্রতিদিন
একটা করে পৃথিবী ধ্বংস হয়।
আমি মানুষের ভিড়ে থাকি,
কিন্তু আসলে আমি একা—
ভীষণ একা।
তবুও প্রতিরাতে
দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে বলি—
আমার মেয়েটাকে একটু আদর করে রেখো,
সে খুব নরম ছিল…
আর যদি কখনো
আকাশের ওপার থেকে
আমার বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাও,
তবে ক্ষমা করে দিও মা—
কারণ তোমাকে হারানোর পর
আমি আর মানুষ নেই,
আমি শুধু
ভাঙাচোরা বাবা।
ক্ষমা করিস মা…।