ফিলিস্তিন ও লেবাননে নৃশংসতা চালানোর অভিযোগে ইসরায়েলকে তীব্র সমালোচনা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একইসঙ্গে তিনি কারাবাখ ও লিবিয়ায় তুরস্কের অতীত সামরিক হস্তক্ষেপের মতো ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও অনুরূপ পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। রোববার (১৩ এপ্রিল) জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
রোববার ইস্তাম্বুলে আন্তর্জাতিক এশিয়া-রাজনৈতিক দল সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় এরদোয়ান বলেন, ‘রক্তে রঞ্জিত গণহত্যাকারী চক্রটি সব ধরনের মানবিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে কোনো নিয়ম বা নীতি ছাড়াই নিরীহ শিশু, নারী ও বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা অব্যাহত রেখেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলকে থামানোর জন্য আমাদের শক্তিশালী হতে হবে। আমরা যেভাবে কারাবাখ ও লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলাম, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারি। আমাদের ঠেকানোর মতো কেউ নেই।’
এরদোয়ান অভিযোগ করেন, লেবাননে ১২ লাখ মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেছে ইসরায়েল। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি বন্দীদের জন্য ইসরায়েলি পার্লামেন্টে (নেসেট) মৃত্যুদণ্ড পাসের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘বর্বর’ পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
দিনের পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এরদোয়ান তার বক্তব্য আরও কঠোর করেন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল যাতে ফিলিস্তিনের ওপর গণহত্যা চালাতে না পারে, তার জন্য আমাদের শক্তিশালী হতে হবে। আমরা যেভাবে কারাবাখে প্রবেশ করেছি, যেভাবে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছি, তাদের ক্ষেত্রেও আমরা তাই করব। এটা করতে আমাদের বাধা দেওয়ার মতো কিছুই নেই। আমাদের শুধু শক্তিশালী হতে হবে।’
এরদোয়ানের এই হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন ইসরায়েলি হেরিটেজ মন্ত্রী আমিচাই ইলিয়াহু। তিনি তুরস্ককে ‘ভণ্ড’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যারা উত্তর সাইপ্রাস দখল করেছে এবং কুর্দিদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, তাদের মুখে নীতির কথা মানায় না। এরদোয়ান নিজেকে অটোমান সুলতান মনে করেন, কিন্তু তিনি একজন স্বৈরশাসক যার দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ছে এবং গণতন্ত্র মৃত।’
ইলিয়াহু তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করার প্রস্তাব ইসরায়েলি সরকারের কাছে উত্থাপন করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি এআই-জেনারেটেড ছবি শেয়ার করেন, যেখানে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জেরুসালেমের টেম্পল মাউন্টে পতাকা উড়াচ্ছেন এবং এরদোয়ান তাঁর পায়ে পড়ে আছেন।
এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার তুরস্কের একটি আদালতের সিদ্ধান্তের পর। ২০১৫ সালের অক্টোবরে ‘সুমুদ’ গাজা ফ্লোটিলা (ত্রাণবাহী জাহাজ বহর) আটকের ঘটনায় তুরস্কের আদালত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গাভিরসহ ৩৬ জন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে। ইস্তাম্বুলের প্রধান প্রসিকিউটর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন।
নৌবহরটির অংশগ্রহণকারীদের (গ্রেটা থুনবার্গসহ) ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আটক করার জের ধরে তুরস্ক এই অভিযোগপত্র দাখিল করে। এতে অভিযুক্তদের দীর্ঘ কারাদণ্ডের দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলি নেতারা এরদোয়ানকে ‘কাগুজে বাঘ’ ও ‘ভণ্ড’ আখ্যা দিয়ে পাল্টা অভিযোগ করেছেন। নেতানিয়াহু এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ‘নিজের কুর্দি নাগরিকদের গণহত্যার’ অভিযোগ তুলেছেন। এর জবাবে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতানিয়াহুকে ‘বর্তমান সময়ের হিটলার’ বলে অভিহিত করেছে।
শনিবার এক্স-এ (টুইটার) পৃথক পোস্টে নেতানিয়াহু, কাৎজ ও বেন-গাভির সবাই তুরস্কের অভিযোগপত্রের জবাব দিয়েছেন। বেন-গাভির় নেতানিয়াহুকে ‘বর্তমান সময়ের হিটলার’ বলে অভিহিত করেছে।