বাংলাদেশের অভিজ্ঞ পেসার রুবেল হোসেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন। ৩৬ বছর বয়সী এই ডানহাতি পেসার গত বুধবার সামাজিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেন। তার বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে সোমবার মিরপুরে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে সংক্ষিপ্ত আয়োজনে তাকে সম্মাননা জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
রুবেল সকালে ছেলে আয়ানকে সঙ্গে নিয়েই স্টেডিয়ামে আসেন। যেখানে টসের পর ছেলেকে পাশে নিয়েই মাঠে প্রবেশ করেন তিনি। সেখানে বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে কিছু সময় আলাপ করতে দেখা যায় তাকে। এরপর শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।
বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফরা মাঠে দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। উপস্থিত ছিলেন বোর্ডের অস্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম বাবু, ফাহিম সিনহা এবং প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি। সম্মাননা হিসেবে রুবেলের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট এবং তিন সংস্করণের জার্সি, যেখানে খোদাই করা ছিল তার বোলিং পরিসংখ্যান।
রুবেলের ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর কথা উঠলে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার অসাধারণ বোলিংই সবার আগে মনে পড়ে। সেই ম্যাচে তার দুইটি স্মরণীয় ডেলিভারিতে জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় দল। ওই ম্যাচে তিনি নেন চারটি উইকেট।
চার উইকেট যেন তার ক্যারিয়ারের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ওয়ানডেতে সাতবার চার উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি একবার পাঁচ উইকেট পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে মিরপুরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ ২৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে গড়েন দেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড, যা যৌথভাবে রয়েছে মাশরাফি বিন মর্তুজার সঙ্গে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার আরও একটি স্মরণীয় পারফরম্যান্স আসে ২০১০ সালে, মিরপুরেই। সেই ম্যাচে ২৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দলকে হোয়াইটওয়াশে সাহায্য করেন তিনি। ফলে এই মাঠটি তার ক্যারিয়ারে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। সম্মাননা শেষে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে উইকেট ছুঁয়ে দেখেন রুবেল, কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন—সম্ভবত স্মৃতির পাতা হাতড়ে দেখছিলেন নিজের পথচলা।
রুবেল তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ২০২১ সালের এপ্রিলে, নিউজিল্যান্ড সফরে টি-টোয়েন্টিতে। ঠিক পাঁচ বছর পর, একই মাসে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
অবসরের পর বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবাল নিজেই তাকে ফোন করে সম্মাননা জানানোর উদ্যোগের কথা জানান। এ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রুবেল।
তিনি বলেন, অবসর ঘোষণার পর বোর্ড সভাপতির ফোন পাওয়া তার জন্য গর্ব ও আনন্দের ছিল। এত সুন্দরভাবে সম্মানিত করার জন্য তিনি বোর্ড ও সভাপতিকে ধন্যবাদ জানান।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় রুবেলের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই চার উইকেট নিয়ে চমক দেখান তিনি। তবে পরের ম্যাচেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে।
ক্যারিয়ারে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এই পেসার ১০৪ ওয়ানডেতে নিয়েছেন ১২৯ উইকেট। ২৭টি টেস্টে তার শিকার ৩৬টি উইকেট। আর টি-টোয়েন্টিতে ২৮ ম্যাচে নিয়েছেন ২৮ উইকেট।
দেশের ক্রিকেটে তার উঠে আসার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ‘পেসার হান্ট’ কার্যক্রমের। এজন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান তার কোচ সরওয়ার ইমরানের প্রতি, যিনি তাকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এছাড়া শৈশব থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত সব কোচ, ফিজিও, মাঠকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষভাবে স্মরণ করেন তার বাবা-মাকে, যাদের সমর্থন ও ভালোবাসা তাকে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
সবশেষে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান রুবেল। অনুষ্ঠান শেষে প্রেস বক্সে গিয়ে সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন তিনি, আর অনেকেই তার সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখেন।