রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নোভোরোসিস্কে ইউক্রেনের ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি টার্মিনাল এবং রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে। রাতভর চালানো এ হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আট বছরের এক শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৪ জন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার নৌঘাঁটিতে হামলা চালাতে ইউক্রেন ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও নৌ-ড্রোন ব্যবহার করে একটি ‘অনন্য অভিযান’ পরিচালনা করেছে। তবে শস্য টার্মিনালে আঘাত হানার বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
পরে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, হামলায় রাশিয়ার চারটি যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ফ্রিগেট রয়েছে। রাশিয়া এখনো যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এই দাবি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, রাশিয়ার দখলদার নৌবহর এবং সেটিকে সহায়তা করা অবকাঠামো যতদিন রুশ আগ্রাসন চলবে, ততদিন নিরাপদ থাকবে না।
নোভোরোসিস্ক রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বন্দর এবং দেশটির কৃষ্ণসাগরীয় শস্য রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় শস্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাসকে জানিয়েছে, বুধবারের হামলায় তাদের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠানও রয়টার্স ও রাশিয়ার আরবিকে সংবাদমাধ্যমকে টার্মিনালে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
রাশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান লজিস্টিক সংকট বিবেচনায় পণ্য পরিবহনের কিছু অংশ বাল্টিক ও কাস্পিয়ান সাগরের বন্দর এবং স্থলপথে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। তবে বিবৃতিতে ইউক্রেনের হামলার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম রপ্তানিকারক দেশ। মস্কোভিত্তিক একটি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আগস্টে রাশিয়ার গম রপ্তানি গত পাঁচ বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ শস্য ও কৃষি অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, এসব হামলার কারণে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং শস্যের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
তবে জাখারোভা একই সঙ্গে বলেন, আজভ ও কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তার জন্য হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথে নেভিগেশন পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে ইউক্রেনীয় বাহিনী যেসব স্থাপনা ব্যবহার করে, সেগুলোতে রাশিয়া হামলা চালিয়ে যাবে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাতভর নোভোরোসিস্কে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
হামলার পর নোভোরোসিস্ক শহরে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়। বন্দরের আশপাশে ড্রোন হামলায় বিভিন্ন স্থাপনা ও পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরের পানি সরবরাহও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের অন্যত্রও হামলার খবর পাওয়া গেছে। ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ জানান, ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একজন নিহত হয়েছেন। রাতভর কয়েক শ ড্রোন দিয়ে অঞ্চলটির বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়েছে এবং বহু ভবন, যার মধ্যে আবাসিক স্থাপনাও রয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নোভোরোসিস্কে ইউক্রেনের হামলার পাশাপাশি মঙ্গলবার থেকে বুধবার রাত পর্যন্ত ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকাতেও রাশিয়ার বিমান হামলা হয়েছে। এতে অন্তত ১১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
নিহতদের বেশিরভাগই দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্লাইড বোমা হামলায় প্রাণ হারান।
এদিকে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনের যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মজুতের প্রায় ১০ শতাংশ প্রয়োজন। শীতকাল পার করার জন্য বর্তমান মার্কিন মজুতের ৫ শতাংশ পেলেই যথেষ্ট হবে বলে তিনি দাবি করেন।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর ইউক্রেনের কাছে আড়াই গুণ কম ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া প্রতি মাসে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।