লালমনিরহাটের আদিতমারীতে সাত বছরের শিশু নন্দিনী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করায় বিধানের মা মমতা রানী ও বাবা রনজিত কুমারকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আজ রোববার দুপুরে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক হায়দার আলী আসামীদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষনা করেন।
চাঞ্চল্যকর এই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গঠনের মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ায় নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১৫ জুন বিকেলে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় সাত বছর বয়সী শিশু নন্দিনী। সারারাত খোঁজাখুঁজির পরদিন সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। পরে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে ১৬ জুন নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহন বাদি হয়ে বিধান চন্দ্রকে প্রধান আসামি করে তার বাবা রণজিৎ কুমার ও মা মমতা রানীকে অভিযুক্ত করে আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে আটক করতে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। খবর পেয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বহরে হামলা চালায়।
এসময় সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
গ্রেপ্তারের পর ১৬৪ ধারায় বিধান চন্দ্র হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে পলাতক থাকা বিধানের মা মমতা রানীকেও গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
তদন্ত শেষ করে তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই) আবু সাঈদ মোঃ আইয়ুব তুহিন গত ১৩ আগস্ট মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। এরপর ১৬ আগস্ট আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ১৭ আগস্ট থেকে ১৯ আগস্ট ৩ দিনে এ মামলার ২৩ জনের স্বাক্ষ শুনানী গ্রহন করেন আদালত। পরবর্তিতে মাত্র ৬ কার্যদিবসে ২৩ আগস্ট আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলার রায় ঘোষনা করেন আদালত।
আদালতের এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেনিহত নন্দিনীর বাবা নলনী মোহন বলেন, ‘ন্যায় বিচার পেয়েছি। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এ রায় দ্রুত কার্যকর করে দৃষ্ঠান্ত স্থাপনের দাবি জানাই।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, মাত্র ৬ কার্য দিবসের মধ্যে লালমনিরহাটের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
শিশু নন্দিনীকে হত্যার বর্ণনায় বিধান আদালতকে জানান, কয়েক বছর আগে তার মা মমতা রানী অন্যের সংসারে যাওয়ায় তাকে তালাক দেন তার বাবা রণজিৎ কুমার। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন রণজিৎ। কিন্তু কিছুদিন পরে বিধান আলোচনা করে মাকে তাদের সংসারে নিয়ে আসেন। এতে ওই সমাজ থেকে তাদেরকে একঘরে ঘোষণা করা হয়। যা নিয়ে নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহনের সাথে তাদের বিবাদ হয়। এতে ক্ষিপ্ত হন বিধান চন্দ্র। সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে নলিনীর পরিবারের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করতে থাকেন তিনি। দীর্ঘ এক বছর আগের ঝগড়ার ক্ষোভ মিটাতে কিছুদিন আগে নন্দিনীর বড় ভাই যোতিষ্ঠিকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন তিনি। সেসময় স্খানীয়দের কারণে ব্যর্থ হয় বিধান।
প্রতিশোধের দ্বিতীয় পরিকল্পনা মোতাবেক ঘটনার দিন বিকেলে নন্দিনী ও অপর এক শিশুসহ বাড়ির উঠানে মোবাইলে টিকটক দেখছিল বিধান। এরপর অপর শিশুটি চলে গেলে তার মোবাইলে চার্জ শেষ হয়। তখন মোবাইল চার্জে দিয়ে বিস্কুট মুখে দিয়ে আবারও উঠানে আসে বিধান। সে সময় শিশু নন্দিনী বিস্কুট চাইলে তাকে বিস্কুট দিতে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। এরপর নন্দিনীকে বিস্কুট খাইয়ে গলাটিপে হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভরে রাখে ঘাতক।
জবানবন্দিতে ঘাতক দাবি করেন, প্রথমে নিজ বাড়ির পাশে পাটক্ষেতে গর্ত করে মরদেহ পুঁতে রাখার চিন্তা করেন তিনি। স্থানীয়রা গর্ত করার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান ছাগল মারা গেছে তা পুঁতে রাখতে হবে। দুর্গন্ধ হবে জন্য স্থানীয়রা বাঁধা দিলে পরিকল্পনা পাল্টে নন্দিনীর বাড়ির পিছনের ভুট্টা ক্ষেতে গর্ত করে বিকেল ৫টার পর নন্দিনীর বাড়ির সামনে দিয়ে তারই বস্তাবন্দি মরদেহ নিয়ে তারই বাড়ির পাশের ভুট্টা ক্ষেতে পুঁতে রাখে খুনি। এসব কাজ করার সময় বিধানের বাড়িতে কেউ ছিল না। বাবা মা দুইজন বাড়ির বাহিরে থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ মেটান বিধান।